অগণিত শ্রমিক আছে, সংগঠন কোথায়?

মতামত

বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানি শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার পথে দৃপ্তপদে এগিয়ে যেতে থাকে ষাটের দশকের শুরু থেকে। তখন কলকারখানা ছিল কম। মাত্র কয়েকটি পাট ও বস্ত্র মিল। এ সব কারখানায় শ্রমিক সংখ্যা গোটা পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র দুই লাখের মতো। শ্রমিকদের মূল কেন্দ্র আদমজী, ডেমরা, তেজগাঁও ও টঙ্গী। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও খুলনায় কয়েকটি কারখানায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করত। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় আদমজী-ডেমরার শ্রমিকরাই রাজপথের দখল নিয়েছিল। তারা অবলীলায় ১৪৪ ধারা ভাঙে, কারফিউ উপেক্ষা করে। রাজপথে বুকের রক্ত ঢালে।

স্বাধীনতার আগে শ্রমিকদের সংগঠনে সমাজতন্ত্রের আদর্শ অনুসরণকারী বামপন্থিদের প্রভাব ছিল বেশি। খ্যাতিমান অনেক ছাত্রনেতা শিক্ষা জীবন শেষ করে শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। এ ক্ষেত্রে আমরা কাজী জাফর আহমদ, সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক, মোরশেদ আলী, তাজুল ইসলাম (১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আদমজীতে ধর্মঘট সফল করতে গিয়ে গুণ্ডাদের হামলায় নিহত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করার পর শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য আদমজী জুটমিলে বদলী শ্রমিকের কাজ নিয়েছিলেন) প্রমুখের নাম করতে পারি। কিন্তু দেখা গেল স্বায়ত্তশাসনের ৬-দফা আদায়ের জন্য শ্রমিকরা দলে দলে আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে এ দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসারী হয়ে পড়ছে। 

তিনি শ্রমিকদের মধ্যে বামপন্থিদের শক্ত অবস্থান জানতেন। তাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্দোলনে সামিল করানোর জন্য তিনি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের শ্রমিক এলাকাগুলোতে কাজের জন্য প্রেরণ করেন। এর সুফল মেলে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। শ্রমিকরা স্লোগান তোলে- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মানি না, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই। শিক্ষার্থীদের পাশে শ্রমিকরা এগিয়ে আসে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও রাজপথে নামে। আন্দোলনের প্রবল চাপে সবার প্রিয় মুজিব ভাই মুক্তিলাভ করেন আগরতলা মামলা থেকে। জনগণ তাকে বরণ করে নেয় বঙ্গবন্ধু হিসেবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বামপন্থিরা বলতেন- দেশে কলকারখানায় শ্রমিক সংখ্যা কম। এ দেশে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লব সম্পন্ন করা কঠিন। কিন্তু গত পাঁচ দশকে শ্রমিক সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তৈরি পোশাক কারকানা এবং এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক। এদের মধ্যে ৩০ লাখের আশপাশে হবে নারী। পোশাকের বাইরেও ওষুধ ও চামড়া শিল্প, হিমায়িত মৎস্য শিল্প, কৃষিজাত শিল্প বিকশিত হতে শুরু করেছে। সড়ক ও নৌপরিবহন খাতেও অনেক শ্রমিক কাজ করছে। সঙ্গে আছে  রেলওয়ে খাত, যা সরকারি নিয়ন্ত্রণে।

সরকারি পাটশিল্প সীমিত হয়ে পড়েছে। আদমজী জুটমিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে অনেক জুটমিল গড়ে উঠছে। আদমজীর সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছে গেছে বেসরকারি খাতের আধুনিক প্রতিষ্ঠান আকিজ জুটমিল। অথচ তাদের শ্রমিক সংখ্যা আদমজীর মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ।

বাংলাদেশের সংগঠিত ও তুলনামূলক কম সংগঠিত ছোট আকারের শিল্প মিলিয়ে শ্রমিক সংখ্যা এক কোটির কম হবে না, এমন অভিমত সংশ্লিষ্টদের। এর বাইরে আছে কৃষি খাত। ক্ষেতমজুর সংখ্যা কত? চার কোটি না পাঁচ কোটি? কিংবা আরও বেশি? বলা হয় যে, বাংলাদেশে যত লোক কাজ করে অর্থাৎ শ্রমবাজারে যারা রয়েছে তাদের ৪০-৪৫ ভাগ নিয়োজিত কৃষি খাতে। কম জমির মালিকরাও কৃষিতে শ্রম দেয়। সঙ্গে আছে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক, যাদের অংশগ্রহণ ছাড়া ফসল ফলানো ও ঘরে তোলা অকল্পনীয়। তারা আছেন প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে। কে তাদের হিসাব রাখে? 

সংখ্যার বিবেচনায় শ্রমিক সংখ্যা এখন আর নগন্য নয়, বরং অনেক বেশি। তত্ত্বগতভাবে শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ নির্মাণের আন্দোলনে সামনের সারিতে তাদের থাকার কথা। কিন্তু এ বিপুল শক্তি তাদের শ্রেণি স্বার্থ আদায়ে সংগঠিত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন? কেন বড় বড় কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয় না? মালিকদের অনেক সংগঠন এবং তারা  সুসংগঠিত। তাদের আছে এফবিসিসিআই বা ফেডারেশন চেম্বার। আছে পোশাক শ্রমিকদের বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন আছে, সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন  আছে।  বাস-ট্রাক ও লঞ্চ মালিকদের সংগঠন আছে। হাঁস-মুরগি ও গরুর খামার মালিকদের সংগঠন আছে। কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠন বলতে যা বোঝায়, সেটা কোথায়? কাগজে-কলমে অবশ্য সংগঠনের অভাব নেই। 

এক শ্রমিক নেতা খেদের সঙ্গে বলেছিলেন- প্রতিটি রাজনৈতিক দলেল ‘নিজস্ব শ্রমিক ফেডারেশন’ আছে। কমিটি আছে। কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। কারখানাভিত্তিক কমিটি নেই। কারখানার শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে কোনও শ্রমিক সংগঠন অংশ নেয় না। এর আয়োজনও হয় না। সরকারি কলকারখানা ও ব্যববা প্রতিষ্ঠানে সরকার সমর্থক শ্রমিক সংগঠনের দাপট দেখা যায়। কিন্তু এখন বেসরকারি খাত অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সেখানে কোনো ইউনিয়ন গঠন করতে দেওয়া হয় না। কয়েক বছর আগে আগে জার্মানিতে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ২০টির মতো বাংলাদেশি পোশাক কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীদের প্রতিনিধি সেখানে হাজির ছিলেন। আয়োজকরা চেয়েছিল শ্রমিক ও কর্মচারীদের প্রতিনিধি। কিন্তু বাস্তবচিত্র ছিল হত্যাশাব্যঞ্জক- মালিকরাই ঠিক করে দিয়েছিল শ্রমিক ও কর্মচারী প্রতিনিধি। 

নিষ্ঠুর বাস্তবতা এখন এটাই যে মালিকদের বিভিন্ন সংগঠন সুসংগঠিত চাপ সৃষ্টি এবং অন্যান্যভাবে সরকারের কাছ থেকে এমনকি অন্যায় দাবি আদায় করে নেয়। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করে না। শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি ও অন্যান্য ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে। একইসঙ্গে তারা সতর্ক- শ্রমিকরা যেন কোনোভাবেই সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। তারা রাজপথে নামুক, এটা মালিকরা চায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ভাল অবস্থায় রয়েছে। অনেক শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান ভাল মুনাফা করছে। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিতে তাদের প্রচণ্ড আপত্তি।                

মে দিবসের মূলমন্ত্র ছিল- দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা চিন্তা। শ্রমজীবী মানুষ চিন্তা করবে নিজের ভাগ্য বদলাতে, সমাজ বদলাতে এবং দেশ বদলাতে। কার্ল মার্ক্স বিষয়টি সূত্রবদ্ধ করেছিলেন এভাবে দার্শনিকরা বহু বছর কেবল দুনিয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আসল কাজ হচ্ছে দুনিয়াটা বদলে দেওয়া। এ বদলে দেওয়ার কাজ করতে হবে শ্রমিক শ্রেণিকে, এটাই বললেন রাশিয়ার কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির  ইলিচ লেনিন। তাদের কমিউনিস্ট পার্টিও পতাকাতলে সমবেত হতে হবে। তিনি জার-সম্রাটদের শাসিত রাশিয়াকে এমন একটি দেশে পরিণত করতে উদ্যোগী হলেন, যেখানে মানুষে মানুষে শোষণ থাকবে না। আরও কয়েকটি দেশ এ পথে চলল। 

দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ নয়, এ দাবিতে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট এলাকায় ১৮৮৬ সালের ১ মে শ্রমিকরা বড় ধরনের আন্দোলনে যোগ দেয। সেখানে গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হয়। এ দিবসটিকেই বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে   জাতিসংঘও সদস্য দেশগুলোতে মে দিবস পালনের আহ্বান জানায়। এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশে ‘মে দিবসে’ শ্রমিকরা ছুটি ভোগ করে। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যে আমেরিকায় মে দিবসের  সূচনা, সেখানে এ দিনে ছুটি নেই।

বাংলাদেশে মে দিবসে ছুটি আছে। করোনাকালে শ্রমিকরা হয়ত অন্য সময়ের মতো মিছিল নিয়ে  রাজপথে নামবে না। রং খেলবে না। কিন্তু তাতে তো বঞ্চনা চাপা থাকবে না। তারা নিজেদের ন্যায্য দাবি ও সমস্যা তুলে ধরতে পারছে না, এটাই বাস্তবতা। কয়েক বছর আগে পোশাক শিল্পের মালিক এবং সরকার ও ‘শ্রমিক’ প্রতিনিধিরা মিলে বেতন কাঠামো উপস্থিত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। প্রধানমন্ত্রী ‘সর্বসম্মত’ প্রস্তাব শুনে বলেছিলেন- “এত কম বেতনে শ্রমিকরা কেন কাজ করবে? মালিকরা সরকারের কাছ থেকে যথেষ্ট সুবিধা ভোগ করে। লাভ থাকে ভাল। শ্রমিকরা কেন এতটা বঞ্চিত হবে।” তার এ বক্তব্যে পর শ্রমিকদের বেতন প্রস্তাবিত পরিমাণ থেকে বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু এভাবে কতদিন? শ্রমিকদের কেন কলকারখানায় নির্বাচিত ইউনিয়ন থাকবে না? পাকিস্তান আমলে সীতি সংখ্যক কারখানা ছিল এবং মালিকানা ছিল ব্যক্তি খাতে। এখন বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতের কারখানা অনেক। ১০-১৫ হাজার কর্মীর প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সেখানে কেন শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠবে না? ইউনিয়ন গড়ার অর্থ হচ্ছে শ্রমিকদের স্বার্থ যথাযথ প্রক্রিয়ায় তুলে ধরার আইনী ব্যবস্থা। শিল্পের স্বার্থে এর প্রয়োজন গোটা বিশ্বে স্বীকৃত। আমরা ‘মে দিবস’ পালন করব, কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও দাবির কথা তুলে ধরার সুযোগ দেব না- এটা হতে পারে না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *